🇵🇸 গত ২০ জুলাই ২০২৬-এ হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের রাজনৈতিক ব্যুরোর নতুন প্রধান হিসেবে খলিল আল-হাইয়া-কে (Khalil al-Hayya) নির্বাচিত করেছে। তিনি শহীদ ইয়াহিয়া সিনওয়ারের স্থলাভিষিক্ত হলেন।
খলিল আল-হাইয়া হামাসের একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তিনি ১৯৬০ সালে গাজা সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন। আশির দশকের শুরুর দিকে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগ দেন এবং ১৯৮৭ সালে হামাস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় থেকেই তিনি এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হামাসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০০৬ সালে তিনি ফিলিস্তিনি আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং হামাসের সংসদীয় দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সাল থেকে তিনি গাজায় হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর উপ-প্রধান হিসেবে ইয়াহিয়া সিনওয়ারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন।
খলিল আল-হাইয়া হামাসের অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী বা নেগোশিয়েটর হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের সাথে যুদ্ধবিরতি আলোচনা এবং চলমান সংঘাতের সময়ও তিনি হামাসের পক্ষ থেকে কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় পরোক্ষ আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।তিনি হামাসের বৈদেশিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ইরানের সাথে হামাসের সম্পর্ক বজায় রাখা এবং শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাকে অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। ইসরায়েলি বাহিনীর বিভিন্ন হামলায় তিনি বেশ কয়েকবার আক্রান্ত হয়েছেন। ২০০৭ সালে তার বাড়িতে চালানো এক হামলায় তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য নিহত হন। এছাড়াও ২০২৬ সালের মে মাসে গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার ছেলে আজম আল-হাইয়া নিহত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, তার দীর্ঘ সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, সামরিক ও রাজনৈতিক উভয় পক্ষের সাথে সুসম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার অভিজ্ঞতা তাকে এই পদের জন্য যোগ্য প্রার্থী করে তুলেছে। তিনি এই নির্বাচনে আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা খালেদ মেশালকে পরাজিত করেছেন।
হামাসের সূত্রমতে, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের ক্রমাগত লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কারণে এই নির্বাচন অত্যন্ত গোপনীয় ও জটিল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়েছে।
সাধারণত হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো এবং এর প্রধানকে নির্বাচনের মূল দায়িত্ব থাকে তাদের consultative body বা ‘শূরা কাউন্সিলের’ ওপর। এই নির্বাচনেও কাউন্সিলের মাধ্যমে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে।
নির্বাচনটি ছিল একটি অভ্যন্তরীণ ব্যালট বা ভোটাভুটি প্রক্রিয়া। আল-জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, খলিল আল-হাইয়া এবং সাবেক নেতা খালেদ মেশালের মধ্যে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ‘রান-অফ’ ভোট হয়। কিছু সূত্র অনুযায়ী, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আল-হাইয়া ৩৫-৩৪ ভোটে জয়লাভ করেন।
এই প্রক্রিয়াটি মূলত গাজা উপত্যকা, অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রতিনিধি, প্রবাসী শাখা এবং ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি হামাস সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্তরে সম্পন্ন হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিভিন্ন সময় বন্দিদের সাথে দেখা করতে আসা উকিল বা পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে সীমিত আকারে বার্তা আদান-প্রদান করা সম্ভব হয়। যদিও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কঠোর নজরদারি চালায়, তবুও এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে অনেক সময় কৌশলগত বার্তা বাইরের নেতাদের কাছে পৌঁছানো হয়।
বিজয়ী ঘোষণার পর, হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরো ইস্তাম্বুলে একটি সভায় মিলিত হবে বলে জানা গেছে। সেখানে বিভিন্ন কমিটি গঠন এবং দলের সামগ্রিক নেতৃত্বের কাঠামো পুনর্গঠন করা হবে। এছাড়া, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন পাঁচ সদস্যের নেতৃত্ব পরিষদ ভেঙে দেওয়া হবে এবং এর সদস্যরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পদত্যাগপত্র কাউন্সিলের কাছে জমা দেবেন।
তথ্যসূত্র: দ্য স্ট্রেইট টাইমস, জেরুজালেম পোস্ট, টাইমস অফ ইসরাইল।
ছবি: এএফপি
