🇮🇷 🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের সুরক্ষার অজুহাতে ইরানের সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে একাধিকবার বিমান হামলা চালিয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, এই সামরিক পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের দিকে যাবে না, তবুও পরিস্থিতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত হামলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জুন ২০২৬-এ স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (MoU) নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরে যে তীব্র মতবিরোধ ও বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক সংঘাতের একটি অন্যতম প্রধান কারণ। মধ্যস্থতাকারী এবং বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরেই মূলত দুটি পক্ষ সক্রিয়। একটি পক্ষ যারা সমঝোতা স্মারকটিকে বাস্তবসম্মত মনে করে এবং এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি চায়। অপরপক্ষে, ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর (IRGC) এবং কঠোরপন্থী আইনপ্রণেতারা এই সমঝোতার ঘোর বিরোধী। তাদের মতে, এই সমঝোতা ইরানের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করেছে এবং এটি পশ্চিমাদের সাথে দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ।
হরমুজ প্রণালীতে সাম্প্রতিক হামলাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি পরিকল্পিত একটি পদক্ষেপ বলে ধারণা করা হচ্ছে। কঠোরপন্থী গোষ্ঠীগুলো মনে করে যে, এই সমঝোতা ইরানকে তার সামরিক শক্তির (যেমন: মিসাইল, ড্রোন এবং ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’) ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোতে বাধ্য করবে। তাই তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করছে যেন যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে সামরিক পদক্ষেপ নেয় এবং পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটি ভেস্তে যায়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব নিয়েও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। যদিও তিনি সমঝোতায় স্বাক্ষর করার অনুমতি দিয়েছিলেন, তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে যে, তিনি নীতিগতভাবে এই আলোচনার বিরোধী ছিলেন।
🇶🇦 কাতার ও 🇵🇰পাকিস্তানসহ অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীরা উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের মূল চ্যালেঞ্জ হলো—ইরানের ভেতরে থাকা এই অস্থিতিশীল শক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করা যে, বর্তমান সংঘাতগুলো সরকারের সামগ্রিক নীতির প্রতিফলন নয়, বরং কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাজ।
সারসংক্ষেপে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্ষমতার লড়াই এবং সমঝোতা স্মারকটিকে কেন্দ্র করে থাকা আদর্শিক বিভাজন বর্তমানে এই পুরো শান্তি প্রক্রিয়াটিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইরান সরকার একদিকে পশ্চিমাদের সাথে কূটনীতি বজায় রাখতে চাইছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর চাপের মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে।
ইরানের কট্টরপন্থী নেতা কারা❓
এরা সাধারণত কঠোর ধর্মীয় রক্ষণশীলতা, পশ্চিমাদের সাথে বিরোধ এবং সামরিক শক্তিবৃদ্ধিতে বিশ্বাসী। বর্তমান পরিস্থিতিতে এদের প্রভাব বেশ প্রবল।
🔹মোজতবা খামেনি: সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির ছেলে এবং বর্তমান সুপ্রিম লিডার। তিনি কট্টরপন্থীদের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হন।
🔹গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজে’ই: ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিচার বিভাগের কঠোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত এবং যেকোনো বিরোধিতার ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতা’ (zero leniency) নীতিতে বিশ্বাসী।
🔹আহমাদ ভাহিদি: আইআরজিসি (IRGC)-এর কমান্ডার। তিনি মূলত সামরিক কৌশলের মাধ্যমে শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পক্ষে।
🔹আলীরেজা আরাফি: অভিভাবক পরিষদের সদস্য এবং প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা। তাকে কঠোর রক্ষণশীল ধারার প্রতিনিধি মনে করা হয়।
🔹মোহাম্মদ বাঘের জোলকাদর: সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব, যিনি সামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।
🔹মোহাম্মদ মেহদি মিরবাঘেরি: কট্টরপন্থী ধর্মীয় আলেমদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব।
ইরানের সংস্কারপন্থী নেতা যারা ❗
এই গোষ্ঠীটি সাধারণত অর্থনৈতিক সংকট নিরসনে পশ্চিমাদের সাথে সমঝোতা বা কূটনীতিতে বিশ্বাসী। যদিও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থান বেশ নাজুক।
🔹মাসুদ পেজেশকিয়ান: বর্তমান রাষ্ট্রপতি। তিনি নিজেকে সংস্কারপন্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য পশ্চিমাদের সাথে সমঝোতার পক্ষে কাজ করছেন।
🔹আব্বাস আরাকচি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা নিরসনের পক্ষে কাজ করছেন, তবে এ জন্য তিনি কট্টরপন্থীদের রোষানলে পড়ছেন।
🔹মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ: বর্তমান সংসদের স্পিকার। তিনি কিছুটা জটিল অবস্থানে আছেন; একদিকে তিনি আইআরজিসি’র প্রাক্তন কমান্ডার হওয়ায় কট্টরপন্থীদের সাথে যুক্ত, অন্যদিকে বর্তমান সংকট নিরসনে তাকে অনেকে ‘বাস্তববাদী’ হিসেবে দেখেন।
তথ্যসূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল, আরব নিউজ, গাল্ফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম, আল জাজিরা
ছবি প্রতীকী এ আই দিয়ে তৈরি
