🇦🇷 🇧🇷 আর্জেন্টিনার ফুটবলে কেন কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় দেখা যায় না? নেপথ্যে এক করুণ ইতিহাস। ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিবেশী দেশ। ফুটবলে ব্রাজিলের জাতীয় দলে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ—উভয় বর্ণের খেলোয়াড়দের সরব উপস্থিতি দেখা যায়। কিন্তু আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড় নেই বললেই চলে। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, কেন এমন বৈচিত্র্যহীন? এর পেছনে রয়েছে আর্জেন্টিনার ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও করুণ অধ্যায়।
১৮১০ সালে শুরু হওয়া আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা যুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের বিশাল অংশ অংশ নিয়েছিল। সে সময় দাস প্রথার কবলে থাকা কৃষ্ণাঙ্গদের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিনিময়ে স্বাধীনতার (Manumission) প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। নিজের স্বাধীনতার আশায় তারা জীবনবাজি রেখে লড়েছিল, যা ছিল তাদের দাসত্ব থেকে মুক্তির একমাত্র উপায়।
আর্জেন্টিনার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ১৮৬৫-১৮৭০ সালের রক্তক্ষয়ী ‘ওয়ার অফ ট্রিপল অ্যালায়েন্স’ (🇵🇾প্যারাগুয়ে যুদ্ধ)-এ কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ব্যাপকভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়। সামরিক কৌশলের নামে তাদের যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক বা সম্মুখভাগে মোতায়েন করা হতো। একে সামরিক ভাষায় ‘ক্যানন ফাডার’ (Cannon Fodder) বা কামানের গোলার খোরাক বলা হয়। এতে কৃষ্ণাঙ্গ সৈনিকদের মৃত্যুর হার ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
যুদ্ধে বিশাল সংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষ মারা যাওয়ায় দেশটিতে কর্মক্ষম কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যা এক ধাক্কায় অনেক কমে যায়। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মের জন্মহার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি, ১৮৭১ সালে বুয়েনস আইরেসে ছড়িয়ে পড়া পীতজ্বরের (Yellow Fever) মহামারিতে কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এদিকে ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আর্জেন্টিনা সরকার ‘হোয়াইটেনিং’ (Whitening) বা শ্বেতকরণের নীতি গ্রহণ করে। দেশটিকে একটি “ইউরোপীয় দেশ” হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইউরোপ থেকে বিপুল সংখ্যক শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বিশাল এই অভিবাসনের ফলে আর্জেন্টিনার জনতাত্ত্বিক কাঠামো দ্রুত বদলে যায় এবং কৃষ্ণাঙ্গরা সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে সংখ্যালঘু হয়ে পড়ে।
আর্জেন্টিনার অনেক শাসক (বিশেষ করে ডমিঙ্গো সারমিয়েন্তো) কৃষ্ণাঙ্গদের ‘সভ্যতা বিরোধী’ মনে করতেন। সমালোচকদের মতে, যুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যু বা তাদের বিলুপ্তি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য এক প্রকার ‘পছন্দসই’ পরিণতি ছিল।
পাশাপাশি আর্জেন্টিনা সরকার আদমশুমারিতে কৃষ্ণাঙ্গদের আলাদা জাতিগত পরিচয় রাখা বন্ধ করে দেয়। সরকারিভাবে প্রচার করা হয় যে, আর্জেন্টিনায় কৃষ্ণাঙ্গদের কোনো অস্তিত্ব নেই। এই ‘সাংস্কৃতিক বিস্মৃতি’ বা Cultural Amnesia কৃষ্ণাঙ্গদের ইতিহাসকে পুরোপুরি মুছে ফেলার চেষ্টা করে। এছাড়া, ১৮৭০ ও ১৮৮০-এর দশকে পাতাগোনিয়ায় আদিবাসী নিধনের যে সামরিক অভিযান চলেছিল, সেটিও ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে আর্জেন্টিনাকে একটি শ্বেতাঙ্গ-প্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত করা হয়, কিন্তু আধুনিক জেনেটিক গবেষণা ভিন্ন কথা বলে। ডিএনএ টেস্টে দেখা গেছে, বর্তমান আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের মধ্যেই আফ্রিকান বা আদিবাসী পূর্বপুরুষের জিন রয়েছে। অর্থাৎ, কৃষ্ণাঙ্গরা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, বরং কয়েক প্রজন্মের মিশ্রণ এবং সামাজিক বর্ণবাদের কারণে তারা আর্জেন্টিনার মূল স্রোতে শ্বেতাঙ্গ বা মিশ্র পরিচয়ে বিলীন হয়ে গেছে।
আজ আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়ের অভাব মূলত কয়েক শতাব্দী ধরে ঘটে যাওয়া এক গভীর ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার ফলাফল।
