🇧🇩 দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে, নিজের পরিচয় প্রকাশ করে ফেলা এক মুহূর্তের ভুলে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়লেন ডিবির জালে। রাজধানীর বনানী ডিওএইচএসে এক সফল অভিযানের মাধ্যমে অবসান ঘটলো দীর্ঘ চার দশকের এই পলাতক জীবনের।
মোজাফফর নিজের অস্তিত্ব মুছে ফেলতে কোনো কসরতই বাকি রাখেননি। সম্পূর্ণ নতুন নাম-পরিচয় ধারণের পাশাপাশি চেহারা ও বেশভূষায় এনেছিলেন আমূল পরিবর্তন। গত ৪৫ বছরে নিজের পরিবার ও পুরোনো পরিচিত গণ্ডি থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন তিনি। এমনকি ডিজিটাল নজরদারি এড়াতেও ছিলেন চরম সতর্ক। জীবনের শেষভাগে অতি গোপনে দেশে ফিরে এসে আশ্রয় নেন ঢাকার অন্যতম সুরক্ষিত এলাকা বনানী ডিওএইচএসে। আশপাশের প্রতিবেশীদের কাছে তিনি ছিলেন কেবলই একজন বয়োবৃদ্ধ ও রাজনীতিবিমুখ সাধারণ মানুষ।
দীর্ঘদিন কোনো ক্লু না পেলেও, গোয়েন্দারা হাল ছাড়েননি। ডিবির চৌকশ দল মোজাফফরের মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করে। তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। কয়েক মাস ধরে মেয়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা সেই বাড়ির ঠিকানা নিশ্চিত করেন।
অভিযানের আগে গোয়েন্দাদের কাছে মোজাফফরের একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্যের তথ্য ছিল—তার নাকের নিচে একটি জন্মগত তিল বা আঁচিল রয়েছে, যা চেহারা পাল্টালেও পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না।
বুধবার গভীর রাতে ডিবি পুলিশ ছদ্মবেশে ওই বাসায় গিয়ে হাজির হয়। নিজেদের একটি টেলিকম অফিসের কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়ে তারা দরজা খোলায়। বাসার ভেতর থেকে এক বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি দরজা খুলে কৌতূহল নিয়ে জানতে চান—এত রাতে কী কাজ? গোয়েন্দারা কৌশলে তার চেহারা পর্যবেক্ষণ করেন এবং নাকের নিচে সেই পরিচিত আঁচিলটি দেখে নিশ্চিত হন।
এক পর্যায়ে গোয়েন্দারা জানতে চান, ‘মুরব্বি, আমরা আপনাকে চিনি না, আপনি কে?’ সরল বিশ্বাসে সেই ব্যক্তি উত্তর দেন, ‘আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।
’নিজের মুখেই আসল পরিচয় স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে ডিবির টিম তাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেয়। দীর্ঘদিনের সুচতুর পলাতক আসামি ধরা পড়েন আইনের খাঁচায়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩১ মে সামরিক অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই মেজর মোজাফফর। তিনি কিলিং স্কোয়াডের সক্রিয় সদস্য হিসেবে সরাসরি জিয়াউর রহমানকে গুলি করে হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পরপরই তিনি তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোনে ইংরেজিতে জানিয়েছিলেন—‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’।
অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর মেজর মোজাফফর হোসেন ও মেজর এসএম খালেদ কৌশলে সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যান। দীর্ঘ সময় তিনি ভারতে ছদ্মনামে এবং জাল নথিপত্র ব্যবহার করে আত্মগোপনে ছিলেন। শুধু তাই নয়, ভুয়া পাসপোর্টের সুবাদে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ভ্রমণ করেছিলেন, যে কারণে এতদিন ইন্টারপোল বা বাংলাদেশের গোয়েন্দারা তার কোনো হদিস পাচ্ছিলেন না।
অবশেষে ৪৪ বছর আগের সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ার একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে।
