ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুথি)-র একের পর এক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও ডি ফেক্টো শাসক মোহাম্মদ বিন সালমান। রাজধানী রিয়াদে হুথিদের হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি গোপন বাংকারসমৃদ্ধ রাজপ্রাসাদগুলোর একটি থেকে অন্যটিতে অনবরত স্থানান্তর করছেন বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (WSJ)।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪১ বছর বয়সী এই সৌদি ক্রাউন প্রিন্স সুরক্ষার জন্য একদল বিশেষ ও বিশ্বস্ত নিরাপত্তা রক্ষীর ওপর নির্ভর করছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে জনসমক্ষে তাঁর উপস্থিতি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
রিয়াদে চরম আতঙ্ক, বিমানবন্দর ধ্বংস ও ভয়াবহ হতাহত
সম্প্রতি রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের ভয়াবহ মিসাইল আঘাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চরম পরিস্থিত সৃষ্টি হয়। এই হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।
মিসাইলের আঘাতে বিমানবন্দরের দুটি টার্মিনাল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ছাদের একাংশ ধসে পড়ে। এই হামলায় ২৮ বছর বয়সী এক মিশরীয় বিমানবালা এক হাত হারিয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়ানো ভিডিওতে দেখা যায়, আতঙ্কিত যাত্রীরা রক্তের দাগ মাড়িয়ে লাগেজ হাতে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন।
রোববারও বিমানবন্দরটিতে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়, যার ফলে টার্মিনাল ৪-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়। এছাড়া ইন্টারসেপ্ট করা মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ আবাসিক এলাকা, কিন্ডারগার্টেন ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওপর পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সুরক্ষার খাতিরে রিয়াদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনলাইন ক্লাস চালু করা হয়েছে।
মার্কিন সহায়তা নিয়ে হতাশা ও ট্রাম্পের অবস্থান
পরিস্থিতি সামাল দিতে মাত্র দুই সপ্তাহ আগে একদিনে দু’বার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার জন্য আবেদন (একপ্রকার আকুতি) জানান প্রিন্স সালমান। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “আমি হুথিদের ঝামেলায় জড়াতে চাই না।” পরবর্তীতে তিনি অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে “বিষয়টি ভেবে দেখছি” বললেও, মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে আক্রমণের কোনো ইচ্ছা নেই বলে ইঙ্গিত দেন।
ইজরায়েল-সৌদি গোপন বৈঠক
হুথিদের হামলার পরও ইজরায়েলের কাছ থেকে সরাসরি প্রকাশ্যে সহায়তা নিতে প্রস্তুত নন মোহাম্মদ বিন সালমান। এর পেছনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে তাঁর পুরনো তিক্ততা রয়েছে। ছয় বছর আগে নিওম শহরে তাদের একটি গোপন বৈঠক নেতানিয়াহু ফাঁস করে দিলে রিয়াদ চরম ক্ষুব্ধ হয়।
তবে পর্দার আড়ালে যোগাযোগ থেমে নেই। সম্প্রতি জার্মানির একটি পরিত্যক্ত স্কি রিসোর্টে ইজরায়েল ও ৭টি আরব দেশের সামরিক প্রধানদের মধ্যে একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সৌদি আরবের চিফ অফ স্টাফ এবং ইজরায়েলি ডিফেন্স ফোর্সের (IDF) প্রধান জেনারেল ইয়াল জামির উপস্থিত ছিলেন।
বর্তমানে সৌদি আরব ইজরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফলের জন্য মুখিয়ে আছে। রিয়াদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন,
“নেতানিয়াহুর সাথে নতুন কোনো দুঃসাহসিক অভিযানে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি নির্বাচনে হারলে আমরা নতুন অধ্যায় শুরু করতে পারি।”
ঘাটতিতে এয়ার ডিফেন্স ও অর্থনীতির ধস
অব্যাহত আক্রমণের মুখে সৌদি আরব তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের তীব্র ঘাটতিতে পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজপ্রাসাদ, অবকাঠামো ও তেল ক্ষেত্রগুলোর সুরক্ষায় এয়ার ডিফেন্স ব্যাটারি প্রতিনিয়ত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরাতে হচ্ছে।#অন্যদিকে, এই সংকটে মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বছরের প্রথম অর্ধে বৈদেশিক বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে এবং বেশ কিছু মেগা প্রজেক্ট স্থগিত করা হয়েছে। সৌদি অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৩.৬% সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ওয়াই নেট
ছবি: এএফপি
