ছবি:”গত মাসে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত একজন হুথি যোদ্ধার ছবি, যা জঙ্গি গোষ্ঠীটি সরবরাহ করেছে Houthi Military Media Center/EPA/Shutterstock
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের আগ্রাসন এবং লোহিত সাগরে তেল ট্যাঙ্কারে হামলার মুখে সৌদি আরব এক গভীর কৌশলগত সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে রিয়াদের সামনে এখন কোনো সহজ বিকল্প খোলা নেই।
ইয়েমেনে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানোর জন্য সৌদি আরব হুথিদের সাথে যোগাযোগ করলে দলটি ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫১ বিলিয়ন ডলার দাবি করে। হুথিরা জানায়, বছরের পর বছর ধরে চলা সৌদি হামলা এবং দীর্ঘ অবরোধের খরচ মেটানোর জন্যই এই বিশাল অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। আর্থিক দাবির পাশাপাশি তারা আরও দাবি তোলে যে, সৌদি আরব যেন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ইয়েমেনের শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যার মাধ্যমে রিয়াদ তার দক্ষিণ সীমান্তে একজন ইরান-সজ্জিত প্রতিপক্ষকে মেনে নিতে বাধ্য হবে।

ছবি: অক্টোবরে হুথি হামলার পর রিয়াদের দক্ষিণে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনায় আগুন লাগার দৃশ্য হিসেবে ছবিটি প্রকাশিত হয়েছিল। AFP/Getty Images
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের এই নগদ অর্থের দাবি সৌদি আরবকে ভবিষ্যতে বারবার ব্ল্যাকমেইলের মুখে পড়ার ঝুঁকিতে ফেলবে। সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিজের সহ-প্রতিষ্ঠাতা মাজেদ আল-মাধাজি বলেন, আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় সমস্যা হলো এমন একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করা, যার ফলে দলটি যখনই অতিরিক্ত ছাড় বা অর্থের প্রয়োজন পড়বে, তখনই সামরিকভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারবে।
রিয়াদ যে পথই অবলম্বন করুক না কেন—সতর্ক মিত্রদের আরও সাহায্য করতে রাজি করানোর চেষ্টা হোক বা হুথিদের কাছে গ্রহণযোগ্য শর্তে পৌঁছানোর চেষ্টা হোক—এর জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে।
রাইস ইউনিভার্সিটির বেকার ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিয়ান কোটস উলরিখসেন, যিনি দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চল নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি বলেন:
“২০১৫ থেকে ২০২২ সালের আগের সংঘাতের সময়ের চেয়ে এখন হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে ঝুঁকির ভারসাম্য আরও বেশি, কারণ বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলার প্রভাব বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট করছে।”
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইয়েমেনে কোনো ধরনের বাস্তবিক বা ভূ-রাজনৈতিক সাফল্য ছাড়া হুথিদের সাথে পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় বসতে নারাজ। তবে ইয়েমেনে নতুন করে অতিরিক্ত সেনা পাঠানো অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী হতে পারে এবং দেশের ভেতরেও তীব্র জনরোষের জন্ম দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় রয়েছে সৌদি নেতৃত্ব।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেনের অভ্যন্তরে হুথিদের বারবার চালানো হামলায় এমন সব এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের যেকোনো স্থল হামলার জন্য সমাবেশস্থল বা কমান্ড সেন্টার হিসেবে কাজ করতে পারত। এর মধ্যে ইয়েমেনের শাবওয়া প্রদেশে চালানো একটি হামলাও অন্তর্ভুক্ত, যেখানে অন্তত ৭৫ জন নিহত এবং ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন; গৃহযুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর এটিই ছিল সবচেয়ে মারাত্মক হামলা।
এ বিষয়ে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সামরিক বাহিনীতে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদানকারী অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা কর্নেল ডেভিড ডেস রোশ বলেছেন:
“হুথিরা এডেনের মতো জায়গায় হামলা চালানোর জন্য স্বল্প-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। এডেনে হামলা চালানোর সক্ষমতা ঘোষণা করার ফলে জোটের পক্ষে স্থলবাহিনী এবং অন্যান্য উপাদান সেখানে পাঠানো আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।”
হুথিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়ে গেলেও এর কার্যকারিতা সীমিত। টেক্সাসের তিনগুণ আয়তনের এই দেশটির পূর্ব দিকে ইরান, উত্তরে ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া এবং দক্ষিণে হুথিদের বহুমুখী হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন প্যাট্রিয়ট ও অন্যান্য ইন্টারসেপ্টর সিস্টেমের ওপর নির্ভর করতে হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কাটিয়ে উঠতে কার্যকর স্থল চাপের প্রয়োজন থাকলেও সৌদি আরবের নিজস্ব সেই পরিমাণ স্থলবাহিনী মোতায়েন করার সক্ষমতা সীমিত।

ছবি: এটি গত মাসে সৌদি আরবের একটি বিমানবন্দরে হুথি হামলার পরের দৃশ্য, যা একটি নিরাপত্তা ক্যামেরার ছবিতে ধারণ করা হয়েছিল। AFP/Getty Images
এই সংঘাতে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের ও সম্ভাব্য মিত্রদের অবস্থান রিয়াদের জন্য খুব একটা অনুকূল নয়:
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই): রিয়াদের সাথে তীব্র উত্তেজনার পর ইউএই গত ডিসেম্বরে হুথি-বিরোধী সামরিক অভিযান থেকে সম্পূর্ণ সরে দাঁড়ায়। মূলত দক্ষিণ ইয়েমেনে একটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনে ইচ্ছুক শক্তিগুলোকে আমিরাতের সমর্থন এবং রিয়াদের সাথে কৌশলগত মতপার্থক্যের কারণে এই দূরত্বের সৃষ্টি হয়।
তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সাথে সৌদি আরবের নতুন ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলেও (যেখানে একজনের ওপর হামলাকে সকলের ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হয়) তুরস্কের সংসদ এখনও তা অনুমোদন করেনি। অন্যদিকে, দীর্ঘকাল ধরে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসা পাকিস্তান ইয়েমেনের অভ্যন্তরে কোনো সরাসরি হামলায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
মিশরের পার্লামেন্ট গত অক্টোবরে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তার অনুমোদন দিলেও প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে যেকোনো মিশন কেবল প্রতিরক্ষামূলক হবে। পাশাপাশি, ২০২৫ সালে সপ্তাহব্যাপী সামরিক অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রও বর্তমানে হুথিদের বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ হুথিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও বিভিন্ন অবকাঠামো লক্ষ্য করে তাদের হামলা অব্যাহত রেখেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশটিতে অন্তত ২৬টি হামলার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
এদিকে, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর কোনো নতুন হামলা চালায়, তাহলে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি নতুন সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে বলেছে যে মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এমন হামলা হতে পারে। তেহরান সমর্থিত এই গোষ্ঠীটি এমন পরিস্থিতিতে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে, যা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সবমিলিয়ে, সামরিক চাপ বৃদ্ধি কিংবা কূটনৈতিক সমঝোতা—কোনো পথেই সৌদি আরবের জন্য সহজ কোনো সমাধান এই মুহূর্তে দৃশ্যমান নয়।
তথ্যসূত্র: ওয়াল ষ্ট্রীট জার্নাল
আরো পড়ুন: হুথিদের হামলায় সৌদি বিমান ঘাঁটিতে ইতালির যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত
