আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, পাকিস্তান যদি আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী বা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দেওয়া শুরু করে, তবে এই সংঘাত কেবল দুই দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ এবং দীর্ঘমেয়ায়ী আঞ্চলিক প্রক্সি যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যা সামলানো অত্যন্ত কঠিন হবে।
মূলত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর সীমান্তপার আক্রমণ এবং আফগান ভূখণ্ডে তাদের উপস্থিতি নিয়ে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকেই এই সংঘাতের সূত্রপাত। এই দ্বন্দ্বে নতুন করে এন্টি-তালেবান গ্রুপগুলোকে যুক্ত করার কৌশলগত পদক্ষেপ দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
চীন, রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব এবং কাতার—একাধিক দেশের মধ্যস্থতা এবং গত এপ্রিলে চীনের উদ্যোগে এবং ৫ অক্টোবর মস্কোয় ১০ দেশের আঞ্চলিক বৈঠক কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় এবং কূটনীতি থেকে সরে আসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশেষজ্ঞ ইব্রাহিম বাহিসের মতে, সংঘাতটি এখন আরও বিপজ্জনক এক ‘প্রক্সি স্টেম্যান্ডঅফ’-এর দিকে মোড় নিচ্ছে। একদিকে আফগান তালেবান পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সীমান্ত পার হয়ে আক্রমণকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন টিটিপি) দমন করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে অভিযোগ, অন্যদিকে পাকিস্তানও এন্টি-তালেবান সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা করার কথা ভাবছে।

ছবি: ডিসেম্বর মাসে আফগানিস্তানের স্পিন বোলদাকে পাকিস্তানের সাথে সীমান্ত পারাপারের সময় আফগান নাগরিকরা। ছবিটি দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের জন্য তুলেছেন টমাস মুনিতা।
সাম্প্রতিক এক শনিবারের সংঘাতে পাকিস্তানের দাবি তারা সামরিক ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে আফগান সেনাসদস্যদের হত্যা করেছে, অন্যদিকে আফগান প্রাদেশিক মুখপাত্র সেই দাবি নাকচ করে উল্টো তালেবানের হাতে ১৩ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হওয়ার দাবি করেছেন। এছাড়া সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে তালেবান দাবি করেছিল তারা পাকিস্তান থেকে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করা ২৮ জন মিলিশিয়াকে হত্যা ও ৩২ জনকে আটক করেছে, যা পাকিস্তানি সরকার ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
এ পর্যন্ত এই সংঘাতে অন্তত ১,১০০ আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত বা আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মিলিশিয়া হামলায় ৭৩০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং ইসলামাবাদভিত্তিক পাক ইনস্টিটিউট অব পিস স্টাডিজের মতে চলতি বছর পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর গড়ে প্রতিদিনের বেশি হামলা হয়েছে।
খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং পাকতিয়া প্রদেশের মতো সীমান্তবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ (যেমন ট্যাক্সিচালক বা শিক্ষার্থীরা) বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কারণে চরম অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুতি এবং জীবনজীবিকার সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা গত কয়েক মাসে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ তালেবান-বিরোধী সশস্ত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সাথে সরাসরি বৈঠক করেছেন।
এই বৈঠকগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত এই সশস্ত্র গ্রুপগুলোকে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সাহায্য ও সহায়তা প্রদান করা।
এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি কেবল একটি সূত্রের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং তিনটি স্বতন্ত্র ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে নিশ্চিত করা হয়েছে: পাকিস্তানের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা, এই বৈঠকগুলো সম্পর্কে অবহিত পাকিস্তানের প্রাক্তন একজন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং তালেবান-বিরোধী গ্রুপগুলোর একটির একজন জ্যেষ্ঠ আফগান সদস্য।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি একটি বিরাট পরিবর্তন। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে আফগানিস্তানে তাদের কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখতে তালেবান ও তাদের মিত্রদের ব্যবহার করতো। কিন্তু টিটিপি ইস্যুতে কাবুলের অসহযোগিতার কারণে এখন পাকিস্তান উল্টো তালেবান-বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকেই (যেমন: National Resistance Front বা NRF) সমর্থন দিয়ে আফগানিস্তানে প্রক্সি নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পথ বেছে নিচ্ছে।
পাকিস্তান মনে করছে তালেবান সরকার যেমন আফগান ভূখণ্ডে টিটিপি-কে আশ্রয় দিয়ে পাকিস্তানের ভেতর হামলা চালাতে দিচ্ছে, পাকিস্তানও একইভাবে আফগানিস্তানের বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সাহায্য করে তালেবান সরকারের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করবে।
এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার লড়াই কেবল সীমান্ত সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র যুদ্ধকে নতুন করে উস্কে দেবে।
পরিস্থিতি স্পষ্টতই একটি নিয়ন্ত্রণহীন ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্সি যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
আরো পড়ুন: মাইন হামলায় তালেবান বাদাখশান মেয়র নিহত