ইরান-ইসরাইল-আমেরিকা যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বের তেলবাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা, এশিয়ার শেয়ারবাজারে ধস, বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলো বড় সংকটের মুখে।
BWDN24 | আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১১ মার্চ ২০২৬
তেলের বাজারে ৩০ বছরের সবচেয়ে বড় ঝাঁকুনি
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বিশ্বের জ্বালানি বাজারকে এক অভূতপূর্ব সংকটে ফেলেছে। গত সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম রাতারাতি ব্যারেলপ্রতি $১১৯.৫০ পর্যন্ত উঠে যায় — যা ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সর্বোচ্চ। হামলার আগে যেখানে তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি মাত্র $৭০, সেখানে মাত্র ১০ দিনে দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশেরও বেশি।
Rapidan Energy Group-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ বিশ্বের তেল সরবরাহের ২০ শতাংশ বাধাগ্রস্ত করেছে — যা ১৯৫৬-৫৭ সালের সুয়েজ সংকটের দ্বিগুণ এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ বিঘ্ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ — বিশ্বের তেল পরিবহনে মহাবিপর্যয়
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ। প্রতিদিন প্রায় ১.৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল — অর্থাৎ বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ — এই সরু পথ দিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক, কাতার, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ হয়।
ইরান এই প্রণালীতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার হুমকি দেওয়ায় বাণিজ্যিক ট্যাংকারগুলো চলাচল প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে — কারণ রপ্তানির রাস্তাই নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে তেলের দাম ব্যারেলে $১৫০ থেকে $২০০ পর্যন্ত উঠতে পারে।
বিশ্বের শেয়ারবাজারে ভূমিকম্প
তেলের দামের এই ঊর্ধ্বগতি বিশ্বের শেয়ারবাজারে ভয়াবহ ধস নামিয়েছে। জাপানের নিক্কেই সূচক এক পর্যায়ে ৭ শতাংশ পড়ে যায়, দক্ষিণ কোরিয়ার KOSPI ৮ শতাংশ ধস নামে এবং ওয়ালস্ট্রিটের S&P 500 সূচক ১.৭ শতাংশ পতন হয়। ডাও জোন্স সূচকও একসময় ৯০০ পয়েন্ট পড়ে গিয়েছিল।
JP Morgan-এর বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বাজার এখন শুধু ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি নয়, বরং বাস্তব সরবরাহ বিঘ্নের মুখে পড়েছে — রিফাইনারি বন্ধ ও রপ্তানি সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ট্রাম্পের বিভ্রান্তিকর বার্তা — বাজারে আরও অনিশ্চয়তা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়ে বাজারকে আরও অস্থির করে তুলছেন। একদিকে তিনি জানালেন যুদ্ধ “প্রায় সম্পন্ন”, অন্যদিকে রিপাবলিকান সম্মেলনে বললেন “আমরা যথেষ্ট জিতিনি।” তাঁর এই দ্বিধাবিভক্ত বক্তব্যের পর তেলের দাম $১২০ থেকে দ্রুত $৮৬-তে নেমে আসে — যা বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্তিরই প্রমাণ।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প রাশিয়া, ইরান ও ভেনেজুয়েলার উপর থেকে কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। G7 দেশগুলো কৌশলগত তেল মজুদ ছাড়ার বিষয়েও আলোচনা করছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ ও উন্নয়নশীল বিশ্বে কী প্রভাব পড়বে?
বাংলাদেশ তার জ্বালানি চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। তেলের দাম দীর্ঘমেয়াদে $১০০-এর উপরে থাকলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ ও পণ্যের দাম সরাসরি বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হবে এবং মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
এশিয়ার দেশগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারণ এ অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। চীন একাই ইরান থেকে প্রতিদিন ১৬ লাখ ব্যারেল তেল আমদানি করে। সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে চীনকে বিকল্প উৎস থেকে তেল কিনতে হবে, যা বিশ্ব বাজারে দাম আরও বাড়াবে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
Goldman Sachs সতর্ক করেছে, হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি $১৫০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। JP Morgan-এর বিশ্লেষণ মতে, বর্তমান পরিস্থিতির ঝুঁকি ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের চেয়েও বেশি।
Washington Post জানাচ্ছে, তেলের দাম দীর্ঘস্থায়ীভাবে উচ্চ থাকলে মার্কিন পেট্রোলের দাম গ্যালনপ্রতি $৪ ছাড়িয়ে যাবে, যা ট্রাম্পের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতির জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ শীঘ্রই থামলেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব সপ্তাহ বা মাস ধরে চলবে। ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত, পুনরায় শিপিং রুট স্বাভাবিক করা এবং বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগবে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হওয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: NPR, Al Jazeera, NBC News, Washington Post, Axios, CBS News
